অনুবাদ : লাতিন সাহিত্যের বুম প্রজন্ম নিয়ে হাভি আইয়েন-এর বিশাল নতুন বইয়ের ভুমিকা

“১৯৭৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী মেক্সিকো সিটির প্যালেস অফ ফাইন আর্টস-এর সামনে পার্কের ভেতর দিয়ে হতভম্ব দৌড়ে যাচ্ছেন লেখিকা এলেনা পোনিয়াতোস্কা, হ্যামবার্গারের দোকানে পৌঁছে অনুরোধ করলেন কাঁচা মাংসের স্টেকের জন্যে। পার্কের বেঞ্চে বসে টালমাটাল অবস্থায় অপেক্ষা করছেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস – একটু আগে তার সবচেয়ে নিকট বন্ধুদের একজন তাকে মুখে ঘুষি মেরে ফেলে দিয়েছে, এক গাদা মানুষের সামনে। রাস্তায় চাপা উত্তেজনা, প্যালেসের ভেতরেও একই অবস্থা। খানিক পরেই সেখানে বড় পর্দায় দেখানো হবে পরিচালক রেনে কার্দোনার নতুন চলচ্চিত্র ‘আন্দেজের বন্দী’ – বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে কিভাবে কিছু মানুষ তাদের মৃত বন্ধুদের দেহ ভক্ষণ করতে বাধ্য হয়েছিল, সেই সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ছবি।

“মারিও ভার্গাস ইয়োসা’র ডান হাতের আঙ্গুলগুলো তখনও দপদপ করছে। একটি ঘুষিই মেরেছিলেন, কিন্তু সেটা লেগেছে ভালো। এই দুজনের অন্যান্য বন্ধুরা যারা উপস্থিত, তারা ক্ষণে উদ্বিগ্ন ক্ষণে বিমর্ষ বোধ করছেন। ঠান্ডা মাথায় এক মুহুর্ত চিন্তা করতে পারছেন না কেউ। তিরতির চাপা উত্তেজনা চারিদিকে, বিক্ষিপ্ত মন্তব্য শোনা যাচ্ছে খিঁচুনির মত, মুখে মুখে ভয় আর অসন্তুষ্টির ছাপ। পৃথিবী তার অক্ষে আরেকটি মোচড় দিল। ঠিক সেই মুহুর্তে ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বুম আন্দোলন।

“যদিও এর অস্তিত্ব এখনো কেউ কেউ অস্বীকার করে, বুম শুধু একটি জিনিস ছিল না, ছিল অনেকগুলো জিনিসের সমারোহ। প্রগাঢ়, প্রাণবন্ত এক পাঁচমিশালী যেখানে সবকিছু এসে একত্র হয়েছিল – সুসাহিত্যের বিস্ফোরণ, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের আঁটো-সাটো চক্র, অগুণতি পাঠকসমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক মজলিস, আদর্শ আর শখের সখ্যতায় ঋদ্ধ একটি গোষ্ঠী, সাহিত্য আর রাজনীতি নিয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসু বিতর্ক, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ব্যক্তিগত অনেক নাটক, আনন্দ আর হাসি-খুশির হঠাৎ ঝিলিক।

“দীর্ঘস্থায়ী যে কোন মানব ইতিহাসের মত এখানেও রাগ-বিদ্বেষ ছিল, শারীরিক অসুস্থতা আর মানসিক দুর্বলতা ছিল, ছিল ভালোবাসা, ছিল মৃত্যু, মাতাল হ্যাংওভার আর চোখের অশ্রুও ছিল। বিংশ শতাব্দীর স্প্যানিশ সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বুম, আমাদের চেতনার আমূল পরিবর্তন সাধন করে আরো সমৃদ্ধ, আরো গভীর করে তুলেছিল।

“আমি নিজে বুমকে দেখতে পছন্দ করি সহজ চোখে – স্রেফ একটি সুন্দর গল্প যেটি ঘটেছিল আমার শহরে, আর শেষ হয়েছিল ১৯৭৬ সালের সেই ১২ই ফেব্রুয়ারী খুব অভিনব উপায়ে – গাবোর চোখে একটি রক্তাক্ত, হিমশীতল বীফস্টেক বসিয়ে।”

——————————————————-

সম্প্রতি প্রকাশিত, বহুল আলোচিত এবং প্রশংসিত বৃহদাকৃতির ইতিহাস Aquellos años del boom বা “বুমের সেই বছরগুলো”-র ভুমিকার অনুবাদ। বার্সেলোনার সাংবাদিক হাভি আইয়েনের দশ বছরের গবেষণার ফসল ৮৮০ পৃষ্ঠার এই অমূল্য গ্রন্থ ইতিমধ্যে বুম-প্রজন্ম প্রসঙ্গে অপরিহার্য রেফারেন্সে পরিণত হয়েছে।

মাদক সন্ত্রাসের কবলে বিপন্ন কলম্বিয়া – এভেলিও রোসেরো’র উপন্যাস ‘The Armies’

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলমাস্টার ইসমাইল। কাজ-কাম তেমন নেই, তাই স্ত্রীর চোখ-রাঙ্গানি উপেক্ষা করে প্রতিদিন চলে যান বাড়ির পেছনের বাগানে। গাছ থেকে কমলা পাড়ার নাম করে পাশের বাসার সুন্দরী বৌয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন আড়চোখে। নির্বিবাদ বুড়ো মানুষ, সুনসান এই গ্রামে এভাবেই কেটে যেতে পারতো ইসমাইলের জীবনের বাকি বছরগুলো।

কিন্তু এটা কলম্বিয়া, সময়টা ৯০-এর দশক। দেশ নয়, বরং রণক্ষেত্র – সশস্ত্র মাদক-কারবারী, বিদ্রোহী গেরিলা, সরকারী সৈন্যদলের বহুমুখী সংঘাতে পর্যুদস্ত। একদিন সকালবেলা মর্নিং ওয়াকে গেছেন ইসমাইল, সেদিনই যুদ্ধ বেড়াতে এলো তার গ্রামে। আর্মি, চেকপয়েন্ট ইত্যাদি বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ইসমাইল তড়িঘড়ি ফিরে যান তার স্ত্রীর কাছে – কিন্তু সে নেই। কোথায় গেছে খুঁজে পান না ইসমাইল – উঠিয়ে নিয়ে গেছে আর্মি? নাকি গেরিলারা, মুক্তিপণ তুলতে? ইসমাইলের চারিপাশে বুলেট – গ্রেনেড – আগুন – বিস্ফোরণ – কালো ধোয়া – যুদ্ধ নয়, এক হ্যালুসিনেশন – সাইরেন – এম্বুলেন্স – সারি সারি বুটের শব্দ – আর্তচিৎকার – চাপা কান্না – এই ঘূর্ণির ভেতর দিয়ে ইসমাইল খোঁজেন ওতিলিয়া’কে হন্যে হয়ে, দিগ্বিদিক – হঠাৎ করে পাঠকের মনে হবে একটা পর্দা যেন সরে গেছে, গ্রামে নেই আর, আমরা চলে এসেছি কাফকার গোলকধাঁধার জগতে – সেখানে কে যে হারিয়ে গেছে, ইসমাইলের স্ত্রী নাকি ইসমাইল নিজেই, বলা অসম্ভব।

*

শেষ করলাম এভেলিও রোসেরো’র দুর্দান্ত উপন্যাস ‘দ্য আর্মিজ’ (The Armies)। মার্কেস পরবর্তী যুগে কলম্বিয়ার অন্যতম সফল উপন্যাসিক। কুশলী হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন কলম্বিয়ার ভেঙ্গে-পড়া সমাজ ব্যবস্থা, নব্বইয়ের দশকের নারকীয়তা, যুদ্ধের দামামার সামনে একজন ইসমাইলের অ্যাবসার্ড অসহায়ত্ব। লেখকের আর কোন উপন্যাস অনুবাদ হয়েছে কিনা বলতে পারছি না, কিন্তু এই বইটি নিশ্চিত সুপাঠ্য, পাঠককে ভাবাবে, আচ্ছন্ন করে রাখবে। ২০০৯ সালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফরেন ফিকশন পুরস্কার জিতেছিল। আর চমৎকার অনুবাদের জন্যে ষোল আনা ক্রেডিট পাবেন অভিজ্ঞ অনুবাদক অ্যান ম্যাকলীন।

লেখকের একটি সাক্ষাতকার, ভাগ্যবশত: সাবটাইটেল সহ –

THIS BLOG ON FACEBOOK 

হুলিও কর্তাসারকে নিয়ে গার্সিয়া মার্কেসের স্মৃতিচারণ

1cortazar

আর্টসবিডিতে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একটি প্রবন্ধের অনুবাদ বেরিয়েছে। প্রবন্ধের বিষয় লেখক হুলিও কর্তাসার। সম্পাদকের ভূমিকার সাথে গলা মিলাই:

গত ২৬ আগস্ট ছিলো আর্জেন্টিনীয় ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হুলিও কর্তাসারের শততম জন্মদিন। লাতিন আমেরিকার ‘বুম’ সাহিত্য-আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের একজন। মার্কেস, ফুয়েন্তেস বা মারিও ভার্গাস ইয়োসার মতো ব্যাপক পরিচিতি না পেলেও লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যে নতুন প্রকাশভঙ্গি আর শিল্পরীতির অভিনবত্বের কারণে ‘উপন্যাসের সিমন বলিভার’ হিসেবে তাকে অভিহিত করেছিলেন তার বন্ধু এবং শিল্পের সহযাত্রী কার্লোস ফুয়েন্তেস।

তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাইউয়েলা’ বা ‘এক্কা-দোক্কা’ হিস্পানিক সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ (এবং দুরূহ) উপন্যাস হিসেবে অর্ধশতাব্দী ধরে সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে ছোটগল্পকার হিসেবে তিনি সম্ভবত আরো বেশি সফল – বাংলাতে তার যা কিছু কাজ অনুবাদ হয়েছে, সেগুলো সব ছোটগল্পই। মানবেন্দ্র-র অনুদিত লাতিন আমেরিকান গল্প সংকলনে কর্তাসারের গল্প স্থান পেয়েছে মোট দশটি। এ ছাড়াও সিনেমা অনুরাগীদের কাছে তার একটি পরিচয় আছে – ষাটের দশকের অন্যতম বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ব্লো-আপ’ (আন্তোনিওনি কর্তৃক পরিচালিত) তৈরী হয়েছিল কর্তাসারের একটি ছোটগল্প অবলম্বনে।

‘বুম’-এর গুরুত্বপূর্ণ সব লেখকের সাথেই ছিলো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। ১৯৮৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুর পরপরই লেখক-বন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গার্সিয়া মার্কেস এই লেখাটি পাঠ করেছিলেন মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদের প্রয়াস পেয়েছি। আশা করি পাঠকদের ভাল লাগবে।

*

কর্তাসারের জীবনের শেষ নাটকীয় অধ্যায় নিয়ে নির্মিত হচ্ছে একটি প্রামান্যচিত্র। ট্রেইলার দেখুন এখানে। 

ON FACEBOOK 

Gabo by Anderson

আর্টস বিডি’র ঈদ সংখ্যায় একটি অনুবাদ বেরিয়েছে – প্রখ্যাত সাংবাদিক জন লী এন্ডারসন’এর মার্কেজ স্মৃতিচারণ। ৫৩২ পাতায়। আশা করি প্রয়াত মামাদোর’এর কাহিনী ভালো লাগবে।

https://s3-ap-southeast-1.amazonaws.com/vmags/artsEidJuly2014/index.html

 

হেমিংওয়ে’র সন্ধানে, ওক পার্কে

আব্বার সংগ্রহে গোটা চল্লিশেক বই ছিল – এদের মধ্যে একটি ছিল বেওয়ারিশ। পাতলা এই পেপারব্যাকের কোন প্রচ্ছদ ছিল না – কবে কিভাবে ছিঁড়ে গিয়েছিল। তাই সবার আগে চোখে পড়তো প্রথম পাতায় গুটি গুটি অক্ষরে ছাপা লেখক পরিচিতি। শুরুটা ছিল এরকম – “Ernest Hemingway was born in 1899 in Oak Park, Illinois…”

অল্প কথায় লেখা ছিল হেমিংওয়ের স্বচ্ছল পরিবারের কথা, বিশ্বযুদ্ধে এম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা। যেহেতু গল্পের গদ্য (The Old Man and the Sea) অত্যন্ত সরল ছিল, অল্প বয়সে সেই বইয়ের প্রথম পাতাগুলো বেশ কয়েকবার পড়েছিলাম, যদিও ৮-১০ পাতার বেশি কখনো এগুতে পারিনি, আর সেই বয়সে তেমন একটা বুঝিওনি। এতটুকু খালি বুঝতে পেরেছিলাম যে এক জেলে, অনেকদিন হয়ে গেছে, সাগরে গিয়ে কোন মাছ পায় না। টানা ৮৪ দিন। আদৌ আর কোনদিন পাবে কিনা, সেটাও ভাবগতিক দেখে সন্দেহ।

বড় হয়ে বইটা পুরোটা পড়েছিলাম। একগুঁয়ে মার্লিন মাছের সাথে ততোধিক গোয়াঁড় সান্তিয়াগোর মরণপণ যুদ্ধ – দিনের পর দিনের পর দিন। “‘Man is not made for defeat. A man can be destroyed but not defeated.” স্পেন্সার ট্রেসি’র অভিনয়ে চলচ্চিত্রটি দেখালো বিটিভিতে – ট্রেসি যেন বুড়ো জেলের সাক্ষাত মূর্তি। হেমিংওয়ে আরো পড়লাম – A Farewell to Arms, তারপর স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে For Whom the Bell Tolls। পরের ছবিটিও দেখালো বিটিভিতে। রবার্ট জর্ডানের ভূমিকায় গ্যারি কুপার, আর মারিয়ার ভূমিকায় ছিলেন ইনগ্রিড বার্গম্যান। এই ছবিতে বার্গম্যান-কে দেখে কার মাথা ঠিক থাকতে পারে? স্কুলজীবনে হলিউডের দুইজন অভিনেত্রীর প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলাম – অড্রে হেপবার্ন আর ইনগ্রিড বার্গম্যান। কিশোর বয়সে ‘রোমান হলিডে’ বা ‘ফর হুম দ্য বেল টলস’ বা ‘আনাস্তাসিয়া’ দেখার অবশ্যম্ভাবী পরিনতি।

প্রকৃত সরল লেখা যে আসলে কতটা দুরূহ, এখনো হেমিংওয়ে পড়লে টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে ছোটগল্পগুলো। বাহুল্য নেই, কথা কম। শব্দের ন্যুনতম ব্যয়। কিন্তু অর্থ আর আবেশের কমতি নেই। “I write one page of masterpiece to ninety-one pages of shit. I try to put the shit in the wastebasket.” তার এই উপদেশ মেনে চললে আরো অনেক লেখকই নিশ্চিত লাভবান হতেন। অনুকরণ করেছেন অনেকে, সফল হয়েছেন অল্পই। তরুণ গার্সিয়া মার্কেজ গুরু মানতেন তাকে (আর উইলিয়াম ফকনার’কে) – পাপা’কে প্যারিসের পথে চিনে ফেলার সেই চমতকার কাহিনীটি ভোলার মত নয়।

*

Oak Park, Illinois – শব্দ তিনটি আর মাথা থেকে যায়নি। মনের গহীনে গেঁথে গিয়েছিল কি প্রক্রিয়ায়। ঘটনাক্রমে গতকাল ওক পার্কে গেলাম অবশেষে, আব্বার বইয়ের গুটি অক্ষরগুলো থেকে তিন দশক তফাতে। শিকাগোর একটি উপশহর, সম্ভবত এই শহরের সবচেয়ে অভিজাত, বিত্তশালী এলাকা।

প্রথমে তুলনা করেছিলাম ঢাকার গুলশান-বনানীর সাথে। কিন্তু পরে মনে হলো যে তুলনাটা যথার্থ হয়নি – অতটা স্থূল বা উগ্র তো না। আসল তুলনা হবে সত্তুর বা আশির দশকের ধানমন্ডির সাথে। তেমনই সৌম্য, সবুজ, শান্তিপূর্ণ। রাস্তাঘাট চওড়া-প্রশস্ত, ছায়া দেয় গাছগাছালি। ১০০ বছর আগে নির্মিত বাড়িঘরগুলো নীচু, দোতলা বা তিনতলার বেশী নয়। মৃদু উচ্চারণের অথচ অপূর্ব সুন্দর – এখনও চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ফ্র্যাংক লয়েড রাইটের স্থাপত্য কীর্তি ছড়িয়ে আছে সমগ্র ওক পার্ক জুড়ে – তার বাড়ি আর আর্কিটেকচার ষ্টুডিও খুব দূরে নয়।

তবে সেগুলোর বিবরণ দিয়ে পোস্ট আর দীর্ঘ না করি। এসেছিলাম হেমিংওয়ে-কে খুঁজতে – তার দেখা মিললো অল্পবিস্তর। ওক পার্ক এভিনিউর একটি বাড়িতে জন্ম, কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত এখানেই ছিলেন পরিবারের সাথে। বাড়িটি সংরক্ষণ করা হয়েছে, আর বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিট দূরে রয়েছে হেমিংওয়ে যাদুঘর। দুটোই ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হলো। ধাক্কা খেলাম যখন বৃদ্ধ গাইড রবার্ট গ্লাস আমাকে বললেন – ‘জানো তো আজকে হেমিংওয়ের ১১৫তম জন্মদিন? সে উপলক্ষ্যে পুরো সপ্তাহ প্রোগ্রাম চলছে – গতকাল পার্কে ছিল বাচ্চাদের নিয়ে Running of the Bulls.’

পুলকিত হলাম, দৈবকে ধন্যবাদ দিলাম নীরবে। পাপা’র জন্মদিনেই তার শেকড়ের সন্ধান খুঁজে পাওয়া… গ্রীষ্মের গনগনে গরমে শরীর পুড়িয়ে ওক পার্কের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পায়ে হেঁটে বেড়ানো ষোল আনা স্বার্থক হলো নিমেষে।

FACEBOOK 

পুরনো বই কেনা, ৯০-এর দশকে

নীলক্ষেত তো ছিলই, এখনো আছে। পল্টনের ফুটপাথেও পুরনো বইয়ের ভালো সমাগম ছিল – বিশেষ করে রাশিয়ান বইয়ের – আর কাকরাইল থেকে পল্টন যেতে যেতে ডানে মোড় নিলে এক বিল্ডিঙ্গের খোপের মধ্যে দুটো দোকান ছিল – তাদের বিদেশী বই আর পত্রিকার সমারোহ দারুন ছিল। প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন-কে প্রায়ই দেখতাম সেখানে ৯০-এর দশকে।

নীলক্ষেত আর পল্টনে পাশ্চাত্যের থ্রিলার পাইকারী হারে পাওয়া যেতো – ফ্রেডেরিক ফরসাইথ, জ্যাক হিগিন্স, অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলীন, ইয়ান ফ্লেমিং, ইত্যাদি ইত্যাদি। যদ্দুর জানি, মাসুদ রানা এদের অনেকের প্লট থেকে ধার করেছিল। তিন গোয়েন্দার জন্যেও একই রকম – ফেমাস ফাইভ আর হার্ডি বয়েজ দেদারসে মিলতো। আমার এক বন্ধু হরর আর সাইফাই-এর ভীষণ পাগলা ছিল – স্টিফেন কিং-এর সম্পূর্ণ হরর কালেকশন, এ সি ক্লার্ক আর আসিমভের সায়েন্স ফিকশন, সবই সে যোগাড় করে ফেলেছিল। এখনো তার উত্তরার ফ্ল্যাটে গেলে পাওয়া যাবে দুই দশক আগে কেনা বইগুলো।

ঢাকায় অন্তত দুজন তুখোড় কমিক কালেক্টর-কে চিনতাম – তাদের দুজনের কালেকশনই মূলত নীলক্ষেত-নির্ভর ছিল। একজন ক্রিপটিক ফেট-এর শাকিব, আরেকজন জামিল কমিক্স-এর মালিক এবং নতুন প্রতিষ্ঠিত ঢাকা কমিকন-এর হোতা। নন-পাগলা সাধারণ পাবলিক পড়তো এস্টেরিক্স আর টিনটিন – তবে সেগুলোর দাম অত্যন্ত বেশি ছিল। ফকির স্টুডেন্ট হলে ধরা-ছোয়ার বাইরে, বাপ-মা থেকে ভালো রকম পকেট মানি পেলেই সেগুলো কেনা সম্ভব ছিল।

আর উচ্চমার্গীয় বিদেশী সাহিত্য যারা খুঁজছেন, তাদের জন্যেও প্রচুর রসদ ছিল। পেংগুইন বেশ বড় রকম ভরসা ছিল। টকটকে কমলা সেই বইয়ের স্পাইনগুলো (অথবা কালো স্পাইনের পেংগুইন ক্লাসিকস) সাথে সাথে নজর কাড়তো। তবে সত্যিকারের ভালো বই পাওয়া এবং কেনা খুবই ভাগ্য-নির্ভর ছিল। যেমন ধরেন, লরেন্স অফ আরাবিয়া’র স্মৃতিকাহিনী (যেটা ডেভিড লীনের সিনেমার ভিত্তি) – সেটা স্রেফ একবারই দেখেছিলাম ১০ বছরে। পুরনো ফাটা পেংগুইন কপি হলেও দোকানদার বুঝে ফেলেছিল দাম বেশি রাখতে হবে – ২০০ টাকা নগদ। রাতে বন্ধুকে ফোন দিয়ে তার থেকে টাকা ধার নিয়ে পরদিন সক্কালবেলা গিয়ে সেই বই হাপিস করেছিলাম। যদি আর কোনদিন না পাই? এরকম আরো উদাহরণ ছিল। এখন তাই ওয়ান-ক্লিকে আমাজন থেকে যে কোন বই কিনতে পারাটা সত্যিকারের মিরাকল-এর মত লাগে।

প্রতি সপ্তাহে কম সে কম তিনবার যাওয়া পড়তো ক্লাস শেষে। নতুন বই থাকুক বা না থাকুক, এমনিই যেতাম, জাস্ট ঘাড় বাঁকা করে বইয়ের নাম পড়ার টানে। নিদেনপক্ষে একটা ‘টাইম’ পত্রিকা বা স্পোর্টসওয়ার্ল্ড তো পাওয়া যাবে দিন শেষে। পরেরটার সম্পাদক ছিলেন টাইগার পতৌদি, কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো, অধুনালুপ্ত কিন্তু সত্যি দুর্দান্ত ক্রীড়া পত্রিকা ছিল। কতদিন পকেটের শেষ টাকাটাও দোকানিকে দিয়ে এসেছি – পত্রিকা পড়তে পড়তে নীলক্ষেত থেকে নাখালপাড়া এক টানে হেঁটে চলে এসেছি, মনেও নেই এখন আর।

*

একটা কথা না বললেই না – দোকানিদের এটিচুড খুব জঘন্য ছিল, বিশেষ করে যদি বুঝতো আপনার কাছে কেনার মত টাকা নেই। বই নামিয়ে দেখাতে বললে খালি বলতো – ‘নিবেন? নিবেন?’ এমন চেহারা করতো, যেন পারলে ঝাঁটা-পেটা করে খেদায়।

পরে যখন চাকরি শুরু করলাম, তখন কিভাবে যেন আমিই বনে গেলাম তাদের বেস্ট ফ্রেন্ড! বসার মোড়া, পাশের দোকান থেকে চা – কত কি। মনে মনে হাসতাম।

মহাজাগতিক ঘুড্ডির গল্প

“গোওওওওল… গোওওওল… গোওওওল… আমি কাঁদতে চাই… হায় খোদা… ফুটবলের জয় হোক… গোলাজো… দিয়েগোওওওল… মারাদোনা… কেঁদে ফেলার অবস্থা, আমাকে মাফ করুন… অবিস্মরণীয় দৌড় দিয়ে মারাদোনা সর্বকালের অন্যতম সেরা খেল দেখালেন… মহাজাগতিক ঘুড্ডি… কোন গ্রহ থেকে তুমি নেমে এসেছিলে এভাবে ইংরেজদের পথ রুখে দেয়ার জন্যে? পুরো দেশ যেন এক বজ্রমুষ্টি, আর্জেন্টিনার জন্যে চিৎকার করছে… আর্জেন্টিনা ২ ইংল্যান্ড ০… দিয়েগোল দিয়েগোল… দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা…ঈশ্বর তোমাকে ধন্যবাদ… ফুটবলের জন্যে, মারাদোনার জন্যে, আমার এই অশ্রুগুলোর জন্যে… আর্জেন্টিনা ২ ইংল্যান্ড ০”

২২ জুন ১৯৮৬।

ইতিহাসের সেরা গোলই শুধু দিলেন না মারাদোনা, ধারাভাষ্যকার ভিক্তর হুগো মোরালেস-ও তার কমেন্ট্রি দিয়ে এক ধরনের ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। ‘বারিলেতে কস্মিকো, দে কে প্লানেতা ভিনিস্তে?’ – ‘মহাজাগতিক ঘুড্ডি, তুমি কোন গ্রহ থেকে নেমে এসেছিলে?’ লাইনটি বিখ্যাত হয়ে গেল, মারাদোনার সেই গোলের নামই হয়ে গেল ‘মহাজাগতিক ঘুড্ডি’। এখনও পোস্টার, টি-শার্ট তৈরী হয় তার কমেন্ট্রি সহ, ‘বারিলেতে কস্মিকো’ বললে আর দ্বিতীয়বার বুঝিয়ে বলা লাগে না। (পুরো কমেন্ট্রি নীচের লিংকে।)

২৮ বছর পর মারাদোনা আর হুগো মোরালেস আবার এক হয়েছেন। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে ‘তেলে সুর’ টিভি চ্যানেলের জন্যে একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান করছেন। (‘তেলে সুর’ চ্যানেল স্থাপিত হয়েছিল ভেনেজুয়েলার প্রয়াত নেতা হুগো চাভেজের উদ্যোগে, কাস্ত্রোর মত চাভেজও মারাদোনার বন্ধু ছিলেন।) অনুষ্ঠানে থাকছে বিশ্লেষণ, আড্ডা, কারেকা, বেবেতো, জামোরানো’র মত অতীতের স্টারদের সাথে সাক্ষাতকার।

আর অনুষ্ঠানের নাম? De Zurda – বাঁ পা থেকে।

barrilete cosmico2